Wednesday, May 24, 2017

মরক্কোয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিপুল বিজয়

রাবাত থেকে এএফপি : মরক্কোর মধ্যপন্থী ইসলামী দল গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রথমবারের মত বিপুল বিজয় অর্জন করেছে। গত শনিবারে প্রকাশিত আংশিক নির্বাচনী ফলাফলে আরব বিপ্লবের সূত্র ধরে এই অভাবিতপূর্ব বিজয় লাভ করেছে।  গত এক মাস পূর্বেকার নিউনিশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিপ্লবোত্তর নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলের বিজয় এবং মিসরে বিপ্লবের মাতাল হাওয়া বয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে মরক্কোর ইসলামী দলের এ বিপুল বিজয় অর্জিত হলো। মোট ৩৯৫ আসনের মধ্যে ২৮৮টির ফলাফলে শনিবার এ তথ্য পাওয়া গেছে।
জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) এর প্রধান আব্দেল্লাহ বেনকিরানে বলেছেন, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে অন্য দলগুলোকে নিয়ে জোট সরকার গঠন করা হবে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ বিজয়ী দলের পক্ষ থেকে একজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করবেন। গতকালের এ নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ছিল এক কোটি ৩৬ লাখ এবং এতে শতকরা ৪৫ ভাগ ভোট পড়েছে। নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিলেন সাত হাজার।
পিজেডি সরকার গঠন করলে এটা হবে উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর দ্বিতীয় কোনো দেশে ইসলামী দলের শাসন ক্ষমতায় আসার ঘটনা। এর আগে তিউনিশিয়ায় ইসলামী আন-নেহদাহ দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে।
মরক্কোর ইসলামী দল পিজেডি'র বেশিরভাগ সমর্থক তুলনামূলক গরিব শ্রেণীর এবং দলটি ক্ষমতায় গেলে ইসলামী অর্থনীতি এবং সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভের পর মরক্কোয় এ নিয়ে নয়বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ২০০৭ সালে সর্বশেষ নির্বাচন হয় এবং সেবার শতকরা ৩৭ ভাগ ভোট পড়েছিল।
উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ তার দেশে সম্ভাব্য আন্দোলন ঠেকানোর কৌশল হিসেবে শাসন ব্যবস্থায় তড়িঘড়ি কিছু সংস্কার আনেন।  তবে, এখনো তিনিই দেশটির অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার মালিক।  মরক্কোর বেশ কয়েকটি দল এ সংস্কারকে যথেষ্ট নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নির্বাচনেও অংশ নেয়নি।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তৈয়ব চেরকাউই নির্বাচনোত্তর আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ইসলামপন্থী জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) ৮০টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দলটি ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী আববাস আল ফাসির ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আসন পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দল জিতেছে ৪৫টি আসনে। এ দলটি গত ২০০৭ সাল থেকে পাঁচ দলীয় জোট সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছে। গতকাল রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের কথা। পিজেডির সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল্লাহ বেনকিরানে সাংবাদিকদের জানান, আমরা মরক্কোবাসীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, তারাই ভোট দিয়ে আমাদের প্রার্থীদের বিজয়ী করেছেন। আমরা এতে দারুণ সন্তুষ্ট।
আংশিক ফলাফল ঘোষণার পরপরই প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম সাগর সৈকতবিধৌত রাজধানী শহর রাবাতের রাস্তায় রাস্তায় ব্যাপক আলোকসজ্জা, আতশবাজি, গাড়ির হর্ন বাজিয়ে এবং পার্টির প্রতীক সম্বলিত বর্ণিল ফেস্টুন উড়িয়ে সমর্থকরা আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে।
গত জুলাইয়ে একটি নতুন সংবিধানের দোহাই দিয়ে একতরফাভাবে গণভোট নাটকের মাধ্যমে বাদশাহ ৬ষ্ঠ মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রীর আসন পাকাপোক্ত করেন অধিকাংশ আসন কব্জা করে। গত মার্চে তিনি সংবিধান পরিবর্তনের ঘোষণা দিলে তিউনিশিয়ায় মিসর ও লিবিয়ার মত গণজাগরণের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। অবসান ঘটে দীর্ঘদিনের স্বৈরতন্ত্রের। প্রায় সাড়ে তিনশ' বছরের সুপ্রাচীন একনায়কতন্ত্রের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজা ৬ষ্ঠ মোহাম্মদের পতন ঘটে। নয়া সংবিধানে তার বিশাল ক্ষমতার অনেকগুলোর ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। পিজেডি প্রধান বলেন, তারা অন্যান্য দলের সাথে জোটবদ্ধ হবার পর দলের সদস্যপদ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।
বেনকিরানে দ্য ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর টিভি চ্যানেলকে বলেন, আমাদের দলীয় কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ সরকারে যারা আমাদের সাথে জোটবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালন করবেন তাদেরকে নিয়ে আমরা গণতন্ত্র এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজের পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে। তিনি বলেন, পিজেডি মরক্কোয় তার স্পেভাটার সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করে এতদাঞ্চলে দেশটিকে একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল দৃঢ় অবস্থানে উন্নীত করবে। পিজেডি তাদের সামাজিক কর্মসূচির মধ্যে গ্রীষ্মকালীন সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং মদ বিক্রির ওপর আপত্তি উত্থাপন করে। কিন্তু পরবর্তীতে তারা বৃহত্তর জনমতের বিষয় বিবেচনা করে এবং বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে সে অবস্থান থেকে সরে আসে। এবারের নির্বাচনী প্রচারণাকালে সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, দারিদ্র্যকে অন্তত অর্ধেকে হ্রাস করে এবং চাকরির ক্ষেত্রে বেতন কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ বাড়ানো হবে।
প্রকাশিত: সোমবার ২৮ নবেম্বর ২০১১ | প্রিন্ট সংস্করণ

Wednesday, April 12, 2017

বিশ্বের ২২ জন লিভিং ঈগলের একজন বাংলাদেশী: ঈসরাইলের সবচেয়ে বেশী সংখ্যক বিমান ধ্বংশকারী


প্যালেস্টাইনীদের সংগ্রাম নিয়ে পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই একজন পরিচিত বাংলাদেশীর নাম পেলাম। ইসরাইলের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক যুদ্ধ বিমানকে ভুপাতিত করার রেকর্ডটা ৪৮ বছর যাবৎ উনার দখলে! ভদ্রলোক চারটি পৃথক দেশের বিমান বাহিনীকে সার্ভিস দিয়েছেন, তিনটি ভিন্ন দেশের হয়ে যুদ্ধ করে শত্রুপক্ষের বিমান ধ্বংশ করেছেন এবং তিনটি দেশ থেকেবীরত্বসূচক খেতাব পেয়েছেন! এটাও একটা বিশ্ব রেকর্ড! যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উনাকে পৃথিবীর জীবিত ২২ জন 'লিভিং ঈগল' হিসেবে তালিকাভূক্ত করা হয়েছে!

তিনি এখনো জীবিত আছেন, বাংলাদেশেই আছেন। আমরা ক'জন তাঁকে চিনি? আমরা মুছা ইব্রাহিমের মিথ্যা এভারেস্ট জয়ের কাহিনী শিশুপাঠ্য করি, যাতে করে আগামী প্রজন্ম প্রতারক হতে পারে। কিন্তু সাইফুল আজমদের উপেক্ষা করি, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ কখনো বীর হবার উৎসাহ না পায়। Akm Wahiduzzaman পোস্টটির পড়ার পর বাকিটা কৌতূহল নিয়ে খুঁজে বের করলাম এই জীবন্ত কিংবদন্তীকে... এই জীবন্ত কিংবদন্তী হচ্ছেন  "স্যার সাইফুল আজম"...

সাইফুল আজম ১৯৪১ সালে পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পর ১৯৫৬ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান যান। ১৯৬০ সালে তিনি জিডি পাইলট ব্রাঞ্চের একজন পাইলট হন।

জুন ৬ , ১৯৬৭। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ চলছে। তৎকালীন পাকিস্তান এয়ারফোর্স থেকে ডেপুটেশনে আসা গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম পশ্চিম ইরাকের এক বিমান ঘাটিতে অবস্থান করছে। অনেকটা ভোজবাজির মতোই আকাশে চারটা ইজ্রায়েলি বিমানের ( যাদের কে এস্কোর্ট করছিলো দুইটা ইস্রায়েলি মিরেজ ফাইটার ) উদয় হয়। আকস্মিক আক্রমণে ইরাকি এয়ারফোর্স
বিপর্জস্ত ।ইসারায়েলি ক্যাপ্টেন ড্রোর একের পর এক ইরাকি বিমানের ভবলীলা সাংগ করে চলেছে। তার সাথে সঙ্গী হিসাবে আছে আরেক ইজ্রায়েলি ক্যাপ্টেন গোলান। এই অবস্থায় আকাশে উড়াল দেয় সাইফুল আজম। উড়াল দেবার কিছুক্ষণের মাঝেই তার উইংম্যান কেও ফেলে দেয় ইজ্রায়েলি ক্যাপ্টেন ড্রোর। কিন্তু সাইফুল আজম অন্য ধাতুতে গড়া। একে একে গোলান, ড্রোর সবার প্লেন ফেলে দেয় সে। মোটামুটি একা লড়াই করে ইজ্রায়েলি বিমান গুলোকে ইরাকের আকাশ ছাড়তে বাধ্য করে সে। ক্যাপ্টেন ড্রোর এবং গোলান কে পরে যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক রাখা হয়।

এখন পর্যন্ত আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সংখ্যক বিমান ঘায়েল করার রেকর্ড ক্যাপ্টেন সাইফুল আজমের।

এছাড়া প্রথম বিশবযুদ্ধ থেকে শুরু করে এপর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক শত্রুপক্ষের বিমান ঘায়েল করার রেকর্ড এর তালিকায় ও তিনি উপরের দিকে আছেন। আরব-ইস্রায়েল যুদ্ধে অসাধারণ অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ জর্দান-ইরাক-পাকিস্তান তাকে বীরত্ব সূচক পদকে ভূষিত করে। তিনটি দেশের সম্মান সূচক সামরিক পদক অর্জনের ঘটনা সামরিক ইতিহাসে বিরল। একই সাথে তিনটি দেশের হয়ে যুদ্ধ করা এবং একই ব্যাক্তির দ্বারা একের অধিক শ্ত্রু রাষ্ট্রের (ভারত এবং ইসরায়েল) বিমান ভূপাতিত করার বিরল রেকর্ডের অধিকারীও এই একই ব্যাক্তি।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তাকে সাময়িক ভাবে সারাগোধাতে অবস্থিত ১৭ স্কোয়াড্রন এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আযম এ সময় এফ-৮৬ স্যাবর জেট বিমান এর পাইলট হিসেবে প্রধানত পদাতিক সহায়ক মিশন পরিচালনা করতেন। ১৯৬৫ সালের ১৯ এ সেপ্টেম্বর বিখ্যাত চাবিন্দা ট্যাংক যুদ্ধে অংশ নেন তিনি এবং বিমান থেকে রকেট ও গোলা বর্ষন করে একাধিক ভারতিয় ট্যাংককে ধ্বংস ও অকার্যকর করেন। এসময় চারটি ভারতিয় ”Gnat”জঙ্গি বিমান তাদের উপর আক্রমন করে। সাধারন ভাবে বিমান থেকে ভুমিতে যুদ্ধের উপযোগি অস্ত্র সজ্জিত থাকায় এসময় পাকিস্তানি বিমানগুলির পালিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ফ্লাইট লেফটেনান্ট সাইফুল আযম রুখে দাড়ান এবং বিমান যুদ্ধ বা ডগ ফাইটে একটি ভারতিয় ”Gnat” জঙ্গি বিমান ভুপাতিত করেন। এই কৃতিত্বের জন্য তাকে পাকিস্তানে ”সিতারা-ইজুরায়ত” (বাংলাদেশের বীরবিক্রম এর সমতুল্য, পাকিস্তানের তৃতীয় সামরিক বীরত্বের খেতাব) পদকে ভুষিত করা হয়। 

১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি চারটি F-86 Sabre এর ফরমেশনে অংশ নিয়ে ভারতের ভূমীতে আক্রমণের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করেন। হঠাৎ দুইটি ভারতীয় Folland Gnat (Folland Gnat, F-86 এর চেয়ে Superior) তাদের পথ রোধ করে। ঘটনার জেরে সৃষ্ট ডগফাইটে সাইফুল আজম একটি Folland Gnat গোলাবর্ষণ করে ভূপাতিত করেন (পাইলট,ফ্লাইং অফিসার ভি মায়াদেব নিরাপদে Ejectকরে বেরিয়ে আসলে তাকে যুদ্ধবন্দি করা হয়). অন্য Folland Gnat টি রনেভঙ্গ দিয়েছে বুঝতে পারার পর সেটিকে পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়।

১৯৬৬ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম এবং অপর আরেক জন পাকিস্তানী বিমান বাহিনীর অফিসার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সারওয়ার সাদকে রাজকীয় জর্ডান বিমান বাহিনীতে প্রেষণে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তারা রাজকীয় জর্ডান বিমান বাহিনীর Hawker Hunter অপারেট করতেন। তারা সেখানে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ৫জুন ১৯৬৭ সালে আল মাফরাক থেকে উড্ডয়নের পর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম একটি Mystere IV কে তার দ্বিতীয়শিকারে পরিণত করেন। এই ঘটনার মাত্র দুই দিন পর, ৭ জুন ১৯৬৭ ইরাকী বিমান বাহিনীতে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে পশ্চিম ইরাকী এয়ার ফিল্ড H-3 এ তিনি অবস্থান করাকালে, ইসরাইলী জঙ্গি জেট এয়ার ফিল্ড H-3 আক্রমণ করে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম ইরাকী Hawker
Hunter বিমান নিয়ে উড্ডয়ন করে একটি Mirage III এবং একটি Vautour Bomber ভূপাতিত করেন (Vautour Bomber টির ছোট্ট কিছু ভগ্নাবশেষ সাইফুল আজমের Hunter এ গেঁথে থাকতে দেখা যায়, যা থেকে তার সহকর্মীরা বুঝতে পারেন তিনি বিমানটিকে আকাশেই গুড়িয়ে দিয়েছেন)। উল্লেখ্য Mirage III সাইফুল আজমের Hawker Hunter এর তুলনায় বহুগুণে Superior। এছাড়া Mystere IV ও এয়ার টু এয়ার কমব্যাটের ক্ষেত্রে Hawker Hunter এর চেয়ে Superior। Mirage III, Mystere IV সাইফুল আজমের Skill, Tactics ও সাহসের কাছে পরাস্ত হয়েছে। কিন্তু সাইফুল আযম ও তার স্কোয়াড্রন সাফল্য লাভ করলেও অন্যান্য জর্দানি বিমানগুলি ব্যার্থ হয় এবং ইসরাইলি বোমা বর্ষনে বেশিরভাগ জর্দানি বিমান ভুমিতেই ধ্বংস হয়ে যায় ও রানওয়েগুলি ক্ষতি গ্রস্ত হয়। 
সাইফুল আযম তার সাফল্যের জন্য জর্দানিদের প্রসংশা ও শ্রদ্ধা পান। বাদশাহ হুসাইন তার নিজের গাড়িতে করে সাইফুল আযমকে তার মেস এরৎ পেীছিয়ে দেন। জর্দান থেকে আর উড্ড্য়ন সম্ভব না হওয়ায় জর্দানি বিমান বাহিনীর পাইলটরা প্রতিবেশি ইরাকি বিমান বাহিনীতে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেয়।

সাইফুল আযম আবারও পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে ইরাকি বিমান বাহিনীর হয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। এবারও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে ইরাকি বিমান বাহিনীর হকার হান্টার বিমান নিয়ে তিনি তৎকালিন সর্বাধুনিক ফ্রান্সের "মিরেজ-৩সি" বিমান ভুপাতিত করেন। তিনি একটি ”ভেটর”বোমারু বিমানও ভুপাতিত করেন। তার অসাধারণ কৌশল ও সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে জর্দান সরকার ”ওয়াসমা ই ইস্তেকলাল” বা স্বাধিনতা পদক এবং ইরাক কর্তক ”নওয়াত-ই সুজ্জাত” পদকে ভুষিত করে। জর্ডান ও ইরাক উভয় দেশই তাকে বীর পদক প্রদান করে।

১৯৭১ সালে বাঙ্গালী হওয়ায় তাকে পাকিস্তান বিমান বাহিনী Grounded করে। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলে তিনি নতুন গঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর Director of Flight Safety এবং পরবর্তীতে Director of Operation হিসেবে নিয়োগ পান।
১৯৭৭ সালে তিনি উইং কমান্ডার পদে পদোন্নতি পান এবং ঢাকা বিমান বাহিনী ঘাটির বেস কমান্ডার হন। ১৯৮০ সালে সাইফুল আজম বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণ করার পর তিনি দুই টার্মে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি Film Development Corporation এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।

তিনি ১৯৯১-৯৬ সালে পাবনা-৩ আসন থেকে (চাটমোহর উপজেলা, ফরিদপুর উপজেলা ও ভাঙ্গুরা উপজেলা) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (BNP) পক্ষে পঞ্চম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে নাতাশা ট্রেডিং এজেন্সি, লিঃ (এয়ার ক্রাফট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি একটি ট্রাভেল এজেন্সিও পরিচালনা করেন। স্ত্রী নাতাশা, তিন সন্তানের জনক তিনি।


২০০১ সালে তাকে যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনী বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। তিনি বাইশ জন “Living Eagles”এর একজন। - রসিক হাকিম

See this video:

Tuesday, March 28, 2017

বরেন্দ্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম নেতৃত্ব খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদ


সরদার আবদুর রহমান : বাংলাদেশের উত্তর জনপদ তথা বরেন্দ্রভূমির এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম নেতৃত্বের নাম খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদ। বিংশ শতাব্দীর বিশ-ত্রিশ দশকজুড়ে বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলকে বলতে গেলে একক নেতৃত্ব দিয়ে সেসময়ের অনগ্রসর মুসলিম সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকেন তিনি। একাধারে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য ডেপুটি স্পিকার, রাজশাহী জেলা বোর্ড এবং রাজশাহী পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি এক গৌরবময় সময়কাল অতিবাহিত করেন। একই সময়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠত থেকে তিনি বিরল কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তৎকালীন সময়ে বঙ্গে অন্য কোন নেতার জীবন-ইতিহাস এরূপ দেখা যায় না।
খ্যাতিমান সমাজসেবক, রাজনীতিক ও আইনজীবী খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদ তৎকালীন মালদহ জেলার  (বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা) অন্তর্ভুক্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার রাজারামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হেমায়েতুল্লা বিশ্বাস। এমাদুদ্দীন স্থানীয় স্কুল থেকে বৃত্তিসহ প্রাইমারি পাস করে কিছুকাল নবাবগঞ্জ হরিমোহন সরকারী হাইস্কুলে পড়াশুনা করেন। পরে তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করে রাজশাহী সরকারী কলেজে ভর্তি হন। রাজশাহী কলেজ থেকে ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে এফ.এ. এবং ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ পাস করার পর তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষা জীবন শেষে এমাদুদ্দীন আহম্মদ জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী শহরে ফিরে এসে রাজশাহী জজকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন এবং স্বল্পকালের মধ্যেই আইন ব্যবসায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এসময় তিনি রাজশাহীর একডালা হাট লুট, হিন্দু গৃহবধূ পঙ্কজিনী অপহরণ, সরদহের নিকটে খোর্দ গোবিন্দপুর গ্রামের ডাকাতি প্রভৃতি কয়েকটি বিখ্যাত মামলায় একজন আইনজীবী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। 
রাজনৈতিক জীবন : খান বাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদের সময়কাল (১৮৭৫-১৯৩৬) বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা এদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। তন্মধ্যে ভারতীয় কংগ্রেস ও সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, ১৮৯২ সালের ইন্ডিয়া কাউন্সিল এ্যাক্ট, ১৯০৫ সালের বাংলা বিভাগ ও ১৯১১ সালের বাংলাবিভাগ রদ্, ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন, ১৯১৬ সালের লক্ষেèৗ-চুক্তি, খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন এবং ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এসময়ে বাংলার মুসলমানগণ তাদের অধিকার ও দাবি-দাওয়া সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একই সময়ে রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে বহু ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের সমাবেশ ঘটে। এঁদের মধ্যে বিশ শতকের প্রথমার্ধের রাজনৈতিক কর্মকা-ের  সঙ্গে খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। আইন ব্যবসায় থেকে শুরু করে পরবর্তীতে রাজশাহী পৌরসভা চেয়ারম্যান, জেলা বোর্ড চেয়ারম্যান, বঙ্গীয় আইন পরিষদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে প্রায় তিনদশক রাজনৈতিক উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থেকে পশ্চাদপদ মুসলমানদের অগ্রগতি সাধনে সর্বাত্মœক চেষ্টা করেন। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন মুসলিম স্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী, তেমনি অন্যদিকে ছিলেন সমগ্র বাংলার আন্তরিক হিতাকাংখী। তাঁর মধ্যে আইনের পারদর্শীতা, রাজনীতিজ্ঞান ও দেশহিতৈষণার সমাবেশ ঘটে। উপমহাদেশের পূর্ণ দায়িত্বশীল সরকার তথা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি আজীবন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম করেন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলিম বাংলায় তাঁর নেতৃত্ব যথেষ্ট গুরুত্বের অধিকারী। সমকালের সমাজ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তাঁর কর্মকা- ও চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটে। 
ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত : খান বাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদ রাজশাহীর (দক্ষিণ) মুসলমান নির্বাচকম-লীর প্রতিনিধিরূপে পরপর তিনবার বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে প্রথমবার রাজশাহীর (দক্ষিণ) মুসলমান নির্বাচকম-লীর প্রতিনিধিরূপে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে (১৯২৭-২৯ খ্রি.) আইন পরিষদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ দশ বছর আইন পরিষদে রাজশাহীর গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি বাংলার অবহেলিত মুসলমানদের দুঃখ দুর্দশার কথা বলিষ্ঠ ভাষায় আইন পরিষদে তুলে ধরেন এবং মুসলমানদের অধিকার আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এসময় ইস্টেট পার্টিশন বিল ১৯৩৩, বেঙ্গল মোটর ভেহিকল ট্যাক্স বিল ১৯২৬, বেঙ্গল চিলড্রেন বিল ১৯২১, আগ্রা এবং আসাম সিভিল কোর্ট এ্যামেন্ডমেন্ট বিল ১৯৩৪, বেঙ্গল ভিলেজ সেলফ গভর্নমেন্ট বিল ১৯৩৪, বেঙ্গল মোহামেডান ম্যারেজ এন্ড ডিভোর্ড রেজিস্ট্র্রেশন বিল, ১৯২১ বেঙ্গল টেনান্সি বিল ১৯২৮ প্রভৃতির উপর তিনি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান : ব্রিটিশ শাসনকালে ‘বেঙ্গল লোকাল সেলফ এ্যাক্ট-১৮৮৫’ অনুযায়ী জেলা বোর্ড গঠিত হয় ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে। রাজশাহী জেলা বোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন পদাধিকার বলে রাজশাহীর তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর মি: এ. এইচ. রড্ক। বঙ্গীয় স্বায়ত্বশাসন বিধান অনুসারে তখন পদাধিকার বলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বেই জেলাবোর্ডগুলো পরিচালিত হয়। এমাদুদ্দীন আহম্মদ ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে রাজশাহী জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। স্বায়ত্বশাসিত আইন সংশোধিত হওয়ার পরে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবর্তে নির্বাচনের মাধ্যমে বেসরকারী ব্যক্তি জেলাবোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার অধিকার লাভ করেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত রাজশাহী জেলা বোর্ডের প্রথম নির্বাচনে এমাদুদ্দীন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় নির্বাচনেও তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন রাজশাহী জেলা বোর্ডের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তৃতীয় নির্বাচনে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন নাটোরের রাজা (ছোট তরফ) বীরেন্দ্রনাথ রায়। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত রাজশাহী জেলাবোর্ডের পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করেন দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমদানাথ রায়।
পৌরসভা চেয়ারম্যান : রাজশাহী পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ এপ্রিল। এই পৌরসভার সর্বপ্রথম বেসরকারী চেয়ারম্যান ছিলেন বাবু হরগোবিন্দ সেন। তাঁর পূর্বে সরকারী কর্মকর্তারাই চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন। এমাদুদ্দীন আহম্মদ ছিলেন রাজশাহী পৌরসভার নির্বাচিত প্রথম মুসলমান বেসরকারী চেয়ারম্যান। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ অবধি তিনি উক্ত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে অর্থাৎ এমাদুদ্দীন আহম্মদের পূর্বে কোন (২৩-এর পাতায় দেখুন)
(২১-এর পাতার পর)
মুসলমান রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেননি। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় জেলা বোর্ড ও পৌরসভার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।
খানবাহাদুর উপাধি লাভ : রাজশাহী জেলা বোর্ড ও পৌরসভার নির্বাচনে এমাদুদ্দীন আহম্মদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাজশাহীতে প্রথম মুসলিম নেতৃত্ব স্বীকৃতি লাভ করে। মুসলিম জাগরণে নেতৃত্ব দান করলেও তিনি ছিলেন উদার ও মুক্তমনের অধিকারী। তিনি জনগণের কল্যাণের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর অসাধারণ কর্মদক্ষতা এবং ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার তাঁকে ‘খানবাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি ছিলেন তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্বের লাভ বা লোভ-লালসার উর্দ্ধে থেকে তিনি সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। সে কারণে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি ছিল জনগণের পরম বিশ^াস ও আস্থা। তাঁর প্রচেষ্টায় এবং প্রভাবে অত্র অঞ্চলের অনগ্রসর জনপদের মাঝে নবজীবনের সঞ্চার ঘটে। 
সমাজসেবায় অবদান : এমাদুদ্দীন আহম্মদ ছিলেন বরেন্দ্র অঞ্চলের সমাজসচেতন এক স্মরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এই জনহিতৈষী নেতা জনকল্যাণমূলক সামাজিক কর্মকা-ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এই অঞ্চলে তৎকালীন মুসলিম সমাজের অনগ্রসরতা তাঁকে পীড়িত করে। ফলে তিনি মুসলিম জাগরণে নেতৃত্ব দান করেন। ক্রমে বিভিন্ন সমাজসেবকদের প্রচেষ্টায় রাজশাহীতে রাজশাহীতে গড়ে ওঠে ‘আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম সমিতি’ (১৯০৬ খ্রি:), ‘মুসলিম শিক্ষা সমিতি’ (১৯১৮ খ্রি:), ‘মুসলিম ক্লাব’ (১৯২৯ খ্রি:), ‘খাদেমুল ইসলাম সমিতি’ (১৯৩২ খ্রি:) প্রভৃতি। মুসলিম সমাজের উন্নতি সাধনে এসব সংগঠন প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। এসব প্রতিষ্ঠান ও সমিতির সঙ্গে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। একারণে তিনি জনপ্রিয়তাও অর্জন করেন। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত রাজশাহী গালর্স মাদ্রাসা (পরে হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। এসময়ে রাজশাহী শহরে পি.এন. বালিকা বিদ্যালয় ছাড়া আর কোন বালিকা বিদ্যালয় ছিল না। উক্ত বিদ্যালয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাধান্যের কারণে এবং ইসলামী রীতি-নীতি বা ধর্মীয় শিক্ষালাভের কোন সুযোগ না থাকায় পর্দানশীন মুসলিম পরিবারের মেয়েরা ভর্তি হতে আগ্রহী ছিল না। এছাড়া নি¤œমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মুসলিম পরিবারের মেয়েদের পক্ষে সেখানে ভর্তির সুযোগ লাভ করাও ছিল বেশ কঠিন ব্যাপার। শিক্ষায় অনগ্রসর মুসলমান মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এবং নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী রীতি-নীতি বা ধর্মীয় শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে হাতেম খাঁন মহল্লায় স্থাপিত হয় ‘রাজশাহী জুনিয়র বালিকা মাদ্রাসা।’ বিশিষ্ট সমাজ হিতৈষী মৌলবী মো: পারভেজ আলীর বৈঠকখানায় তাঁর নিজস্ব চেয়ার, টেবিল ও বেঞ্চ নিয়ে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা স্কুল ইন্সপেক্টর বসির উদ্দীন আহমেদ এবং সেক্রেটারি ছিলেন বিশিষ্ট সমাজকর্মী মৌলবী মো: পারভেজ আলী। পরবর্তীকালে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করা হয় হাতেম খান মহল্লায় মির্জা মোহাম্মদ ইউসফের উদ্যোগে এবং মুসলিম জনগণের আর্থিক সহায়তায় নির্মিত ‘রাজশাহী মোহামেডান এসোসিয়েশন’ এর নিজস্ব ভবনে। ভবনটিতে তখন ভাড়া থাকতেন খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন। তিন কক্ষ বিশিষ্ট উক্ত ভবনে চলতো সভা। সম্মিলিত রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের মুক্ত আলোচনা। শিক্ষায় অনগ্রসর নারী সমাজের শিক্ষা প্রসারকল্পে তথা সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে ভবনটি বিদ্যালয়ের জন্য ছেড়ে দিয়ে খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন এরই অপর পাশের্^ একটি খড়ের আটচালা কামরায় নিজে অবস্থান করতে থাকেন। মোহামেডান এসোসিয়েশন-এর নিকট থেকে প্রাপ্ত তিনকক্ষ বিশিষ্ট এই ভবনকে কেন্দ্র করেই বিদ্যালয়টির সম্প্রসারণ ঘটে। খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন কর্মকা-ে বিশেষ অবদান রাখেন। ১৯৫৭ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে এটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে তা ‘রাজশাহী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়’ হিসেবে অত্র অঞ্চলের মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছে। রাজশাহীর এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন যাবত রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল, লোকনাথ স্কুল এবং রাজশাহী হাই মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। রাজশাহী মুসলিম গার্লস মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এর পূর্বে বঙ্গদেশে কোন গার্লস মাদ্রাসা ছিল না। রাজশাহী কলেজ মুসলিম হোস্টেল প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অক্ষয় হয়ে রয়েছে।
তিনি ১৯০৭ থেকে ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে হযরত শাহ মখদুম ট্রাস্টি বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন। এসময় শিক্ষা দীক্ষার উন্নয়ন, ছাত্রবৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি, ছাত্রভর্তি ও ছাত্রদের আবাসিক সমস্যার সমাধান, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, গ্রামীণ প্রাইমারী স্কুল স্থাপন, কৃষির উৎকর্ষ সাধন, কো-অপারেটিভ সোসাইটি স্থাপন, কৃষি ঋণ সরবরাহ, জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ, খাবার পানি সরবরাহের জন্য কূপ ও পুকুর খনন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রশাসনের সকল স্তরে মুসলিম প্রতিনিধি প্রেরণে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালান। রাজশাহীর বর্তমান বিদ্যুৎ ভবনটি ছয় বিঘা জমির উপর নির্মিত। এর সবটুকুই খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদ তাঁর নিজস্ব জমি দান করেন। 
অনাড়ম্বর জীবন : সুঠাম দেহের অধিকারী এই প্রতিভাদীপ্ত কর্মীপুরুষের জীবনযাপন প্রণালী ছিল আড়ম্বর বর্জিত-নিতান্তই সহজ সরল। তিনি ছিলেন কর্তব্যে নিষ্ঠাবান, সদালাপী এবং অন্যায়ের প্রতি আপসহীন এক বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটায় খানবাহাদুর এমাদউদ্দীন আহম্মদ রাজশাহী শহরের হাতেম খান মহল্লায় অবস্থিত তাঁর নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৩ কন্যা ও দুই পুত্র রেখে যান। রাজশাহী হিন্দু-মুসলিমসহ সর্বস্তরের মানুষের শোকাকুল পরিবেশে শাহ মুখদুম (র:) এর মাজার সংলগ্ন মসজিদের ওজুখানার পার্শ্বে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তারপর কয়েকদিন ধরে শহরের বিভিন্ন স্থানে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। ভুবন মোহন পার্কে হিন্দু-মুসলমান সকলে মিলিত হয়ে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বাংলার মুসলিম সমাজের উন্নয়নে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই মহৎ ব্যক্তির নামানুসারে রাজশাহী পৌরসভার একটি রাস্তার নামকরণ করা হয় ‘খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন রোড।’ এছাড়া আর কোথাও তাঁর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার কোন পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। হাতেম খান মহল্লার ‘এমাদুদ্দীন লজ’ তাঁর বসত ভিটার স্মৃতি বহন করে চলেছে।
তথ্যসূত্র : ১. রাজশাহীর প্রথম নির্বাচিত প্রতিনিধি খান বাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদ : মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ। ২. শহর রাজশাহীর আদিপর্ব : মাহবুব সিদ্দিকী, ৩. প্রবন্ধ : রাজশাহীর পাঁচ স্বনামধন্য শিক্ষাহিতৈষী, মোহাম্মদ জুলফিকার।

Popular Posts