Friday, May 25, 2018

নজরুল সঙ্গীতের বিষয়-বৈচিত্র্য

আখতার হামিদ খান: চর্যাপদ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কালের বাংলা গান রচয়িতাদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের গানে বিষয়ের যে বৈচিত্র্য, অন্য কারও গানে তা নেই। যুগের প্রয়োজনে এক এক কালে এক এক বিষয় প্রাধান্য বিস্তার করে। চর্যাগানের মূল বিষয় ছিল আধ্যাত্মিকতা। বৈষ্ণব পদাবলীতে পৌরাণিক বিষয় স্থান পেয়েছে। তার সঙ্গে কোথাও কোথাও প্রেমরস মিশ্রিত হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ের গানে লৌকিক ধ্যান ধারণা প্রবেশ করেছে। পরাধীনতার যুগে এসে গানের বিষয় হয়েছে দেশাত্মবোধ ও বিদ্রোহ চেতনা। এসব ছাপিয়ে সাম্প্রতিককালে প্রাধান্য বিস্তার করেছে মানবীয় প্রেম।
বাংলা গানের বিকাশ ও সমৃদ্ধির ধারায় অন্যতম প্রধান হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম। এছাড়াও বাংলা গানকে যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন, নতুন সুর ও রীতির প্রবর্তন করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামপ্রসাদ সেন, রামনিধি গুপ্ত, দাশরথি রায়, হাসন রাজা, লালন ফকির, বিজয় সরকার প্রমুখ। এঁদের প্রত্যেকের গানেই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। গানের বিষয়, সুর, আবদনে  রয়েছে স্বকীয়তা। কিন্তু অনেকের গানেই বিষয়-বৈচিত্র্য নেই। কেউ শ্যামাসঙ্গীত লিখেছেন তো অন্য কোন বিষয়ে লেখেননি। কেউ শুধু অধ্যাত্মিক ভাবের গান রচনা করেছেন। কেউ বাউল বা কেউ আধুনিক প্রেমমূলক গান। আবার কেউ কেউ নানা বিষয় নিয়ে গান লিখেছেন। কিন্তু এত ব্যাপক বিষয়ের অবতারণা নজরুল ছাড়া শ্যামাসঙ্গীতও রচনা করেছেন। রামনিধি গুপ্ত টপ্পা অঙ্গের গান। দাশরথি রায় পাঁচালি গান রচনা করেছেন। হাসন রাজা-লালন ফকির লোকসঙ্গীত, বাউল গান রচনা করেছেন। বিজয় সরকারের গানের বিষয় আধ্যাত্মিকতা। এঁদের প্রত্যেকের গানেই যে কোন একটি বিষয় নির্ভর করেছে। একই বিষয় ও ভাবের গান রচনা করেছেন সারা জীবন ধরে। ব্যতিক্রম রবীন্দ্র, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ ও রজনীকান্ত,। দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ এবং রজনীকান্ত মূলত ভক্তিমূলক, দেশাত্মকবোধক এবং প্রেম বিষয়ক গান রচনা করেছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল অবশ্য হাস্যরস বিষয়ে কিছু গান রচনা করেছেন। কিন্তু এ তিন জনের গানেই খুব বেশি বিষয় বৈচিত্র্য নেই। বিষয় বৈচিত্র্য রয়েছে রবীন্দ্র-নজরুলের গানে বেশি। এত বিচিত্র বিষয় নিয়ে বাংলার আর কোন গীতিকার সঙ্গীত রচনা করেননি। নানা বিষয় সঙ্গীত লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। নজরুল লিখেছেন তারও বেশি বিষয় নিয়ে।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, গানের বিষয় বলতে আমি গানের মর্মবাণীকে যেমন বুঝাচ্ছি, তেমনি বুঝাচ্ছি সঙ্গীতের ধারা বা শ্রেণীকে। অর্থাৎ কথার অন্তর্নিহিত ভাব কোন আবেদন প্রকাশ করছে, সে অনুসারেই সঙ্গীতের শ্রেণীকরণ করছি। যেমন ভক্তিমূলক, আধ্যাত্মিক, বৈষ্ণব, পদাবলী, কীর্তন, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি, গজল, প্রেমসঙ্গীত ইত্যাদি। সঙ্গীতের এই নানা শাখায় বিচরণ করেছেন নজরুল। রবীন্দ্রনাথও বিভিন্ন, বহু বিষয়ে গান লিখেছেন। যেমনস ব্রহ্মসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক, ভক্তিমূলক, কীর্তন, পদাবলী, প্রেম, প্রকৃতি, সম্প্রীতি, সমাজসচেতনা, আধ্যাত্মিকতা, বাউল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গান রচনা করেছেন। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সুরের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন সুরে। রামপ্রসাদী, কীর্তন, বাউল সুরের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন তাঁর গানে। কিন্তু নজরুল আর একটু এগিয়ে বাংলায় গজল রচনা করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য অর্থাৎ আরবীয় সুরে সঙ্গীত রচনা করেছেন। জারি, সারি, মুর্শিদি, মারফতি, ভাটিয়ালি, গান যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন, শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন, ভজন ইত্যাদি গান; আবার আধুনিক মানবীয় প্রেমসঙ্গীত, রাগসঙ্গীত, বিদ্রোহ ও দেশাত্মকবোধক গানও লিখেছেন নজরুল। 
গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকে নজরুল অজ¯্রভারে গান লিখে যাচ্ছিলেন। সেই গানের ভা-ার পরিমাণে যেমন বিপুল, শ্রেণী বিভাগেও তেমনি বিচিত্র। লঘু বাংলা গান থেকেও গুরুগম্ভীর ধ্রুপদ পর্যন্ত বাংলা গানের হেন শাখা নেই যাতে তিনি গান রচনা করেননি। বিদেশি গানের অনুকরণে বিদেশি সুর বসিয়েও অনেক গান রচনা করেছেন তিনি। বৈচিত্র্য ও বিপুলতা এ দুইই নজরুলের সঙ্গীত প্রতিভার প্রাচুর্যের স্বাক্ষর বহন করে।’
প্রায় চার হাজার গান রচনা করেছেন নজরুল। এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আর নজরুলের গানের কথা, সুর ও বিষয়-বৈচিত্র্য সকলকে বিস্ময়াভিভূত করে। বৈষ্ণব যারা তাঁরা রাধাকৃষ্ণের বাল্যলীলা, প্রেমলীলা ও গোষ্ঠিলীলায় সুর-চিত্র দর্শনের দুর্লভ সুযোগ লাভ করবেন নজরুলের রচনায়। শাক্ত যিনি, তিনি শ্যামামায়ের পায়ের তলায় নিজের মনটিকেও একটি রাঙা জবা করে ধরে দিতে পারেন নজরুলের শ্যামসঙ্গীতের খেয়ায় ভেসে। মুসলমান যিনি, তিনি ঈদের বাঁকা চাঁদ প্রথম দেখার আনন্দে আত্মহারা হবার ভাষা খুঁজে পাবেন এই নজরুল গীতির ভা-ার থেকেই। প্রেমিক যিনি, তিনি প্রেমের বিভিন্ন স্তরের সুখের ও শোকের সাড়া পাবেন নজরুলের গানে। তাঁর হাসির  গানের সংখ্যাও কম নয়। তাঁর দেশাত্মবোধক গান সারা বাংলা তথা ভারতের নিপীড়িত জনগণের অন্তর মথিত বাণী।
সারা জীবন নজরুল নানা জায়গা ঘুরছেন, বিচিত্র পেশা গ্রহণ করেছেন, বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। নিজে ছিলেন শিল্পী এবং সুর¯্রষ্টা। আর তাই অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়ই তার সঙ্গীতের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর কর্ম এবং অভিজ্ঞতা যেমন বিচিত্র ছিল; তেমনি তাঁর গানের বিষয়ও বিচিত্র ছিল। সঙ্গীত ছিল তাঁর একান্ত ব্যক্তিক অনুভূতির পরিম-ল। সঙ্গীত রচনাতেই সম্ভবত তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন বেশি। আর এ কারণেই তার সঙ্গীত এত বিপুল ও বৈচিত্র্যময়। জাত-পাতে তাঁর বিশ^াস ছিল না। তিনি মানুষ। তিনি সর্ব জাতির, সর্ব ধর্মের। আর এ বোধেরই প্রকাশ দেখা যায় তাঁর বিচিত্র বিষয়ের গানে। এদিকে যেমন লিখেছেন ভজন, কীর্তন, শ্যামসঙ্গীত, অন্যদিকে তেমনি লিখেছেন ইসলামি ভক্তিমূলক গান, জারি, সারি, মুর্শিদি মারফতি।
লেটোর দলকে কেন্দ্র করেই কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গীত ও কাব্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। এখানেই একই সঙ্গে বহু বিচিত্র বিষয়ে গান রচনায় তাঁর হাতে খড়ি হয়। লেটোর দলের জন্য পালা রচনা করতে গিয়ে মুসলিম ও হিন্দু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় ঘটে। তিনি একদিকে যেমন মুসলিম জীবনধারা থেকে কাহিনী ও গীত রচনার উপাদান সংগ্রহ করেন, অপরদিকে হিন্দু পৌরাণিক উপাখ্যানের পটভূমিতেও পালাগান রচনা করেন। তাঁর সে সময়কার রচনাতেই এই দুই ঐতিহ্য¯্রােতের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। নজরুলের পরবর্তীকালের বহু রচনায় মুসলিম ও হিন্দু ঐতিহ্যের যে অসামান্য সহাবস্থিত রূপটি প্রকাশ পেয়েছিল, তার সূচনা ঘটে এই পর্বে। তাছাড়া লেটোর দলের সঙ্গে যুক্ত হবার ফলে তিনি বর্ধমান অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়েও সুযোগ পেয়েছিলেন। সে অঞ্চলে বিশেষভাবে প্রচলিত ঝুমুর গানের সঙ্গে সে সময়ই নজরুলের পরিচয় ঘটে। পরবর্তীকালে ঝুমুর অঙ্গে বহু গান রচনা করেছিলেন তিনি। এই বিচিত্র অভিজ্ঞতার প্রকাশই তাঁর নানা গানে। এমন কোন বিষয় নেই, যে বিষয় নিয়ে তিনি গান রচনা করেননি।
নজরুলের এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, বিশাল বিষয়-বৈচিত্র্যময় সঙ্গীত ভা-ার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাংলা গানে যে সব ধারা প্রচলিত রয়েছে, নজরুলের গানেও সে সব ধারা রয়েছে। নজরুলের  গানের উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো হচ্ছে- ভজন, কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি, মুর্শিদি, মারফতি, হামদ, নাত, আধুনিক প্রেমসঙ্গীত, গজল, রাগসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক, বাউল সঙ্গীত, ঝুমুর, বিদ্রোহমূলক, হাসির গান ইত্যাদি। বাংলার আর কোন সঙ্গীত রচয়িতা এত বিচিত্র বিষয় নিয়ে গান রচনা করেননি। নজরুল গানের এই প্রত্যেকটি শাখায় সফলতা লাভ করেছেন।  এখানেই নজরুলের শ্রেষ্ঠত্ব। 
নজরুলের গানে এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে ভজন গান। ভজন এক জাতীয় আরাধনা সঙ্গীত বা ভক্তিগীতি। ঈশ্বর বন্দনাই এ গানের উদ্দেশ্য। অন্য কোন বাংলা গান রচয়িতা নজরুলের মত এত উৎকৃষ্ট, সমৃদ্ধ এবং বিপুল ভজন রচনা করতে সক্ষম হননি। তাঁর ভজন তথা হিন্দুধর্মীয় সঙ্গীত যেমন বিপুল, তেমনি বিস্ময়কর সঙ্গীত যেমন বিপুল, তেমনি বিস্ময়কর রকম বৈচিত্র্যপূর্ণ। ‘হে গোবিন্দ রাখো চরণে’, ‘সখি সে হরি কেমন বল,’ ‘খেলছি এ বিশ্ব লয়ে,’ ‘অনাদি কাল হতে অনন্ত লোক গাহে তোমারি জয়’, ‘আহার দিবেন তিনি রে মন, জিভ দিয়াছেন যিনি,’ ‘অঞ্জলি লহৈা মোর সঙ্গীতে’, ‘কোথা তুই খুঁজিস ভগবান’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গানসহ বহু ভজন লিখেছেন নজরুল।
বুলবুলের মৃত্যু নজরুলের জীবনে এক গভীর পরিবর্তনের বীজ বপন করে। অগ্নিগর্ভ কবিতা ও গীত রচয়িতা বিদ্রোহী নজরুল এই শোকের আঘাতে অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়েন। এক প্রকার আধ্যাত্মিকতা তাঁকে গভীরভাবে পেয়ে বসে। অন্তর্গত বিষাদ ও আধ্যাত্মিকতাই যেন ছিল তার চৈতন্যের বাদীস্বর। সেই সময় থেকেই নজরুলের ভেতরে ভক্তিমূলক গান লেখার প্রবণতা দানা বাঁধতে থাকে। এবং পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলাম ও হিন্দু ধর্মীয় আবেগের পটভূমিতে প্রচুর গান রচনা করেন। ভজনগুলো সেই অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। নজরুলের গানের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই ভজন জাতীয় গানগুলো। কোন কোন ভজন গানে শিবের আরাধনা ব্যক্ত হয়েছে। কোনটায় কৃষ্ণের কথা। পদাবলী কীর্তনের ঢঙে নজরুল প্রচুর কীর্তন রচনা করেছেন। কথা ও সুরে পুরোপুরি কীর্তন। কিছু গান ভজনও বলা চলে, আবার কীর্তনও বলা চলে; দুইয়েরই প্রভাব রয়েছে। যেমন: ‘হৃদি পদ্মে চরণ রাখো, বাঁকা ঘনশ্যাম; গোষ্ঠের রাখাল বলে দেরে কোথায় বৃন্দাবন ইত্যাদি।
পদাবলী কীর্তন বা কীর্তন গান বাঙালির বহু কালের ঐতিহ্যের ধারক। এগুলো বাঙালির অন্তর-সম্পদে পূর্ণ। বাংলার নিজস্ব ঢঙ, চিরায়ত সুর এ গানে বিধৃত। রবীন্দ্রনাথও বহু কীর্তনাঙ্গের গান রচনা করেছেন। নজরুলের কীর্তন খুবই ঋদ্ধ। কথা ও সুরের সার্থক সমন্বয় ঘটেছে নজরুলের কীর্তনে। আধুনিককালে যাঁরা কীর্তন গান রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে নজরুলের কীর্তনই শ্রেষ্ঠ এবং সংখ্যায়ও প্রচুর। উল্লেখযোগ্য কীর্তনগুলো হচ্ছে- ‘বাজে মঞ্জুল মঞ্জীর’, ‘সখি আমিই না হয় মান করেছিনু; ‘ওরে নীল যমুনার জল, আমি সুখে লো গৃহে রব, ‘না মিটিতে মনোসাধ, ‘মন মানস মাধবী ফুটিল কুঞ্জে, মণি মঞ্জীর বাজে অরুণিত চরণে, ‘এলো নন্দের নন্দন নবঘনশ্যাম। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীর চেয়ে নজরুলের এ কীর্তনগুলো শিল্প সফরতায় কোন অংশেই কম নয়।
নজরুলের গানের একটা বিশাল অংশ জুড়ে যেমন রয়েছে ভজন এবং কীর্তন গান; তেমিন ব্যাপক অংশ জুড়ে রয়েছে শ্যামাসঙ্গীত। এত বিপুল পরিমাণ শ্যামাসঙ্গীত নজরুল ছাড়া আর কেউই লেখেননি। নজরুল ইসলামি ভাবধারার গানের থেকে অনেক অনেক বেশি তাঁর শ্যামাসঙ্গীত। রামপ্রসাদ শ্যামাসঙ্গীত রচনার সূত্রপাত করেন। নজরুল শ্যামাসঙ্গীতে কোথাও শ্যামা মাতৃরূপিণী, কোথাও কালীর রৌদ্রী রূপের ভয়ঙ্কর বর্ণনা, আবার কোথাও দেশাত্মবোধের প্রেরণা প্রকাশিত। অন্যান্য গানের চেয়ে নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং পরিমাণের প্রচুর বেশি। তাঁর উল্লেখযোগ্য শ্যামাসঙ্গীত হচ্ছে- ‘বলরে জবা বল;’ ‘শ্যামা নামের লাগলো আগুন, আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়, শ্মশানকালীর রূপ দেখে যা; শ্মশানে জাগিছে শ্যামা, ‘থির হয়ে তুই বস দেখি মা; ‘ভারত শ্মশান হলো মা তুই; আয় মা চঞ্চলা মুক্তকেশি শ্যামা কালী; শ্যামা তোর নাম যার জপমালা; ওমা খড়গ নিয়ে মাতিস রণে।
নজরুল প্রচুর পরিমাণে জারি, সারি, ভাটিয়ালি এবং পল্লীগীতি রচনা করেছেন। এসব গানেও বাঙালির, আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আবেগ যেন এসব গানে স্থির হয়ে রয়েছে। ‘পদ্মার ঢেউরে, মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে, যা যারে, এ বিখ্যাত গানটি ভাটিয়ালি গানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়াও রয়েছে- ‘নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে, এইতো নদীর খেলা; আমার গহীন জলের নদী; নদীর নাম সই অঞ্জনা; বাঁশি বাজায় কে কদম তলায়, ওগো ললিতে, পথভোলা কোন রাখাল ছেলে’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গান।
ভক্তিমূলক গান রচনায় নজরুল অদ্বিতীয়। নজরুলের ইসলামি ভাবধারায় গানগুলোতে মুসলিম ঐতিহ্য ধরা পড়েছে। মুর্শিদি মারফতি হামদ নাত প্রভৃতি বিষয়ে নজরুল ইসলামি ভাবধারায় প্রচুর গান লিখেছেন। ভক্তি, শরণাগতি ও মাহাত্মবোধের প্রেরণা থেকে নজরুল ইসলাম ধর্ম সম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে ুদই শতাধিক গান রচনা করেছেন। এই সব গান নজরুলের ইসলামি গান রূপে খ্যাত। বাংলায় ইসলামি ভক্তিগীতির প্রবর্তন নজরুলই প্রথম করেন। তাঁর রচিত ইসলামি গান বাংলা গানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। বাংলায় ইসলামি গানের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকারও নজরুল। আল্লাহর প্রশস্তি, রসূল প্রশস্তি, ধর্মীয় বিধান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, উপাসনা, উপাসনালয় প্রভৃতি নানা বিষয় অবলম্বনে নজরুলের ইসলামি গানগুলো রচিত। নজরুলের উল্লেখযোগ্য ইসলামি গানগুলো হচ্ছে- ‘মহম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে, রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে; খোদার প্রেমেরর শরাব পিয়ে; শোনো শোনো ইয়া ইলাহী আমার মোনাজাত; মওলা আমার সালাম লহ; ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়; মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই; মরু সাহারা আজ মাতোয়ারা; মোহাম্মদ মোর নয়ন-মণি; তোমার নুরের রোশনী মাখা; রোজ হাশরে আল্লাহ আমার করো না বিচার।’
আধুনিক বাংলা প্রেমগানের বিশিষ্ট রূপকার নজরুল। তৎকালীন ছায়াছবির একটা প্রধান অংশ জুড়ে ছিল নজরুলের গান। আধুনিক গানকে নজরুলই জনপ্রিয়তা দান করেছেন। তাঁর আধুনিক গানের আবেদন আজকে এতটুকু হ্রাস পায়নি। আধুনিক গানের পরিমাণও নজরুলের কম নয়। নজরুলের আধুনিক গানের সুর বৈচিত্র্য আশ্চর্যভাবে বিস্ময়কর। কালজয়ী কিছু গান গভীর নিশীতে ঘুম ভেঙ্গে যায়; তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি, প্রিয়, জনম জনম গেল আশা পথ চাহি; মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম; আজো মধুর বাঁশরী বাজে; আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো; তবু আমারে দেবো না ভুলিতে; যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই, কেন মনে রাখো তারে; আমি চাঁদ নহি অভিশাপ; মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে, বিদায় সন্ধ্যা আসিল; মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী; ভীরু এ মনের কলি; মোর না মিটিতে আশা ভাঙিল খেলা ইত্যাদি।
বাংলায় গজল গানের প্রচলন মূলত নজরুলই করেন। গজল মূলত পারস্য প্রেম সঙ্গীত। ফার্সি কবিরা গজল রচনা করতেন। এ প্রেম ঐশী প্রেমপ্রার্থী। অন্য সকল প্রকার কাব্যগীতির মত জগলেরও সঙ্গীতাদর্শ হচ্ছে সুরের সাহায্যে গানের বাণীকে ধ্বনিত করে তোলা, যেন পদবাহিত ব্যঞ্চনা সুরের স্পর্শে প্রমূর্ত হয়ে উঠতে পারে। 

Thursday, May 24, 2018

জানেন - ফাঁসিরকাষ্ঠে ঝুলন্ত কে এই মহানব্যক্তি ? তিনি হচ্ছেন আদনান মেন্ডারিস, তুরস্ক

(একবার ক্লিক করে ভিডিও চালু না হলে ২য় বার ক্লিক করুন):+

See this photo:
জানেন - ফাঁসিরকাষ্ঠে ঝুলন্ত কে এই মহানব্যক্তি ?
তিনি হচ্ছেন আদনান মেন্ডারিস, তুরস্কের লাগাতার তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ... ১৯৫০—১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বলতে পারবেন , কোন অপরাধে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ? তার অপরাধ (?) তিনি তুরস্কে আরবিতে আযান দেওয়া বৈধ বলে ডিক্রি জারি করেছিলেন যা কুলাঙ্গার কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল ... এতেই সেদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সেনাবাহিনী সংবিধান লঙ্ঘনের দোহাই দিয়ে এই মহান ব্যক্তিকে এভাবেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছিল ... তাই বলে কি তুরস্কে ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে গেছে ? দেখেন না , আজ এই তুরস্কই মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিমরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছে !

এ থেকে আমাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষের ধ্বজাধারীরা যেনো কিছুটা হলেও শিক্ষা নেন ...।


Thursday, May 10, 2018

চট্টগ্রাম রাঙ্গুনিয়ার অধিবাসী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির ইবনে মোহাম্মদের পূর্বপুরুষেরা চট্টগ্রামে রাঙ্গুনিয়ার অধিবাসী ছিলেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির ইবনে মোহাম্মদ আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে সমাদৃত। গত বুধবার দেশটির ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে ফের ক্ষমতার আসনে বসেন এ নেতা। ২২২টি সংসদীয় আসনের ১১৫টি জয় পেয়ে হারিয়েছেন তারই শিষ্য নাজিব তুন রাজাককে। এই মাহাথির মোহাম্মদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন বাংলাদেশের বাসিন্দা।
২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মাহাথির বলেন, “চট্টগ্রামের কাপ্তাই রাঙ্গুনিয়ার কোন একটি গ্রামে আমার দাদার বাড়ি ছিলো, পরবর্তীতে মালয়েশিয়াতে বসবাস শুরু করেন দাদা” তার এই কথার সূত্রধরেই খোঁজ নিয়ে যানা যায় চট্টগ্রাম জেলার উত্তরাংশে রাঙ্গুনিয়া উপজেলাধীন চন্দ্রঘোনা ও কাপ্তাইগামী সড়কের সামান্য পূর্বে কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম মরিয়মনগর।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এ গ্রামের এক যুবক ব্রিটিশ শাসিত মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। তিনি ছিলেন জাহাজের নাবিক। মালয়েশিয়ায় এ্যালোর সেটর গিয়ে এক মালয় রমণীর সঙ্গে সম্পর্কে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরেই জন্ম নেন মুহম্মদ ইস্কান্দার। আর এই মুহম্মদ ইস্কান্দারের ছেলে সন্তান হিসেবে জন্ম নেন মাহাথির মুহম্মদ। সে হিসেবে চট্টগ্রাম হচ্ছে মাহাথির মুহম্মদ এর পূর্বপুরুষের দেশ এবং সে অনুযায়ী বাংলাদেশী রক্ত তার শরীরে বহমান।
১৯২৫ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ অধ্যুষিত মালয়ের কেদাহ অঞ্চলের অ্যালোর সেতার নামক স্থানে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে মাহাথির মুহম্মদ জন্মগ্রহণ করেন। পিতামাতার দশ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন মাহাথির। তার পিতা মুহম্মদ বিন ইস্কান্দার ছিলেন মালয়ের একটি ইংলিশ স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক

সূত্র: ওয়েবসাইট ও উইকিপিডিয়া

Friday, April 27, 2018

ঘরে ঘরে হতে হবে পাঠাগার হাতে হাতে পৌঁছে দিতে হবে বই -সালাহউদ্দিন আইউবী


মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ এবং অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে জ্ঞানের দিক থেকে। যে জ্ঞানের সূচনা হয়ে থাকে পড়ার মাধ্যমে। যে কারণে পৃথিবীতে আগত যুগে যুগে সকল নবী-রাসূলের জীবনগঠনের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রথম বাণী ছিল ‘পড়’। পৃথিবীর যেসব মহামানব আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের কর্মের শুরু সেই পড়া থেকেই। অসভ্য, বর্বর জাতিগুলোর সভ্যতার দিশা দেয়া হয়েছে যুগে যুগে পড়ার নতুন নতুন কৌশলের মাধ্যমে। পড়া মানুষকে এক উচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন করে। পরিবার সমাজ রাষ্ট্র সবখানে পড়ুয়া শ্রেণীর কদর সম্পূর্ণই আলাদা। দিকভ্রান্ত জাতির পথের দিশা হয়ে বারবার সুন্দর সমাধান দিয়েছে পড়–য়া জাতি।
বই পড়তে পারাটা একটা ম্যাজিকের মতো। হাজার বছরের সমস্ত মানুষের কথা ইচ্ছে করলেই জানা যাচ্ছে। ইচ্ছে হলেই বেড়ানো যাচ্ছে মিসর, বেবিলন মেসোপটেমিয়া, ভারতবর্ষের সেই প্রাচীন সভ্যতায়।
পড়ার অভ্যাস করতে পারাটা একটা বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার। তারা খুবই দুর্ভাগা যাদের পড়তে শেখার সুযোগ হয়নি। তাদের চেয়েও দুর্ভাগ্য তাদের যারা পড়তে শিখেও পড়ল না।
মানুষ সাধারণত খুব নিকট অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না। জৈবিক ধারণাতেই তাদের জীবন চালিত। অতীত বলতে তাদের থাকে কিছু স্বার্থগত স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ বলতে কিছু সঞ্চয় পরিকল্পনা। খাওয়া খাদ্য বাসস্থানের স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প কিছু ইতর শ্রেণীর প্রাণীর থাকে। জ্ঞানের শুরু থেকে মানুষ খুঁজে গেছে মানুষের সাথে পশুর পার্থক্যটা আসলে কত দূর? সেই পার্থক্যের সত্যিকারের উপলব্ধির জন্য আল্লাহর বাণী পাঠালেন পড়ো তোমার প্রভুর নামে। জানিয়ে দিলেন মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। তাই সক্রেটিস বলেছিলেন তুমি নিজেকে জানো।
বই মানুষের চিন্তার খোরাক। বই পড়ে মানুষ চিন্তার জগতে বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারে। বই না পড়ে যে মানুষ নিগূঢ়তম চিন্তার জগতে ঢুকতে পারে না, তা নয়। কিন্তু ওটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যথোপযুক্ত লোক খুঁজে নিয়ে তার সাথে দীর্ঘ আলাপ চালানো হতে পারে এক ধরনের চিন্তার খোরাক। বই হচ্ছে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে সহজতম পদ্ধতি হাজার বছরের মানুষের চিন্তার ইতিহাসকে সংযুক্ত করার। হয়ত ভবিষ্যতে এর চেয়ে সহজ কোনো উপায় বের হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব সুন্দর করে বলেছেন, মহাসমুদ্রের শত বছরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরবতা শব্দের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবতার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে। ইহারা সহসা যদি বিদ্রোহী হইয়া ওঠে, নিস্তব্ধতা ভাঙিয়া ফেলে, অক্ষরের বেড়া দগ্ধ করিয়া একেবারে বাহির হইয়া আসে! হিমালয় মাথার ওপরের কঠিন বরফের মধ্যে যেমন কত বন্যা বাঁধ আছে, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে মানবহৃদয়ের বন্যাকে বাঁধিয়া রাখিয়াছে!

জীবন বদলে দিতে পারেন
আপনি যদি প্রতিদিন ৩০-৬০ মিনিট স্টাডি করেন তবে প্রতি সপ্তাহে আপনার একটি বই সম্পন্ন হয়। প্রতি সপ্তাহে একটি বই সম্পন্ন হলে প্রতি বছর সম্পন্ন হয় ৫০টি বই। আর আপনি যদি সিলেকটিভ ফিল্ডে ৫০টি বই সম্পন্ন করেন তবে প্র্যাকটিকেল ফিল্ডে একটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জিত হয়। কারণ মেজর ইউনিভার্সিটিতে একটি পিএইচডি প্রোগ্রামে সিলেবাসে ৪০ থেকে ৫০টি বই পড়ানো হয়ে থাকে। যদি এভাবে বছরে ৫০টি বই স্টাডি ধারা অব্যাহত রাখেন তবে পরবর্তী ১০ বছরে আপনার পঠিত বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫০০তে। যেখানে বিশ্বের মানুষ গড়ে মাত্র একটি বইয়ের কম স্টাডি করেন সেখানে সিলেকটিভ ফিল্ডে আপনি যদি ৫০০ বই স্টাডি করেন তবে আপনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের কতটা উচ্চমার্গে উত্তীর্ণ হবেন, ভাবতে পারেন?
সত্যি বলতে আপনি যদি প্রতিদিন ভোর বেলায় ৩০-৬০ মিনিট স্টাডি করার অভ্যাস করতে পারেন তবে এটি আগামী দশ বছরের মধ্যে আপনাকে আপনার ফিল্ডের smart reader, most knowledgeable, most expert, highest paid successful person এ উন্নীত করবে আপনি পৃথিবীর এমন কোন successful person পাবেন না যারা daily study habit এর মাধ্যমে নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনেননি।
আমার পরিচিত বইপড়–য়া একজন ব্যক্তিত্ব হলেন অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলের নির্বাচিত সাবেক ভিপি, একসময়ের রাজপথ কাঁপানো তুখোড় ছাত্রনেতা। যিনি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই সরকারি অর্থায়নে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানাবিধ সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। তাকে আমি তার ব্যক্তিজীবনের অবিস্মরণীয় এই যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম- তিনি শুধু বলেছিলেন ‘আমি কখনো দিনের বেলা ঘুমাই না। সবাই যখন ঘুমাতো আমি তখন পড়ালেখা করতাম। ফজরের নামাজের পর সবসময় কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পড়ালেখার অভ্যাস আমার ছিল ; এখনো যেটা আমি অব্যাহত রেখেছি।’

ব্যবহারিক টিপস
১.আপনার study field সিলেক্ট করুন ও সিলেবাস তৈরি করুন।
২.টিভি, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া ও সকল প্রকার ইলেকট্রিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার একটি নিয়মতান্ত্রিকতার আওতায় নিয়ে আসুন এবং সময় অপচয় রোধ করুন।
৩.দিনের সকল কাজের লিস্ট করুন এবং সময় ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী শিডিউল তৈরি করুন।
৪.প্রতিদিন ফজরের আগে ঘুম থেকে জাগুন।
৫.পড়ালেখার মাধ্যমে দ্বীনের কাজ শুরু করুন এবং আপনার মনে ইনভেস্ট করুন।
আগামীকাল থেকে তো অনেক কিছুই শুরু করলাম, এবার না হয় আজ থেকে শুরু করি, কেমন?

বই পড়ার কৌশল
সবার পড়ার ধরন এক রকম নয়। একেকজনের পড়ার ধরন একেক রকম। অভিজ্ঞতার আলোকে শেয়ার করছি : নতুন কোনো বই পেলেই বই ও লেখকের নাম এবং কতটা ভালো করে দেখি। লেখক পরিচিতি থাকলে একনজর দেখা উচিত। অনেক সময় মূল মলাট উল্টালেই লেখকের কথা চোখে পড়ে । এটা অবশ্যই পড়তে হবে। তাতে বইয়ের মূল বক্তব্যটা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।
এরপর পড়া শুরু হয় সূচিপত্র থেকেই। অতীব গুরুত্বপূর্ণ কোন অধ্যায় পেলে সেখানেই কৌতূহলী মন নিয়ে আগে ঢু মারি। তা না হলে সকল অধ্যায় সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে প্রথম অধ্যায় থেকেই করতে থাকি। হাতের কাছে লাল কালির কলম থাকতেই হবে। লাল কালির কলম ছাড়া মার্কিং করা কঠিন। সচরাচর লাল, নীল এবং সবুজ তিনটি কলম এবং অনেক ক্ষেত্রে text liner অথবা marker pen ব্যবহার করা যায়।
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলোতে বা কোন বিখ্যাত ব্যক্তি বা মনীষীর উক্তি পেলে লাল কালি দিয়ে underline বা text liner দিয়ে mark করে রাখি। তবে অপেক্ষা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলিতে সবুজ, কখনো নীল কালি ব্যবহার করি; যাতে বিষয়ের ভিন্নতা সহজেই চোখে পড়ে। এতে করে পরবর্তীতে এই বিষয়টা খুঁজে বের করতে অনেক সহজ হয়।
কোন নতুন বই ও লেখকের নাম উল্লেখ থাকলে লাল কালি দিয়ে গোল চিহ্ন দিই। ইংরেজি বা অন্যান্য বিদেশি কোনো শব্দ পেলে গোল চিহ্ন দিয়ে ডিকশনারি থেকে অর্থ বের করে পাশের ফাঁকা জায়গায় অ্যারো চিহ্ন দিয়ে রাখি। নতুন কোন পারিভাষিক শব্দ তার এ টু জেড অভিধান ঘেঁটে বের করার চেষ্টা করি বা পড়ে ফেলি (ব্যস্ততা না থাকলে)!
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর পাশে তারকা চিহ্ন ব্যবহার করি। খুব বেশি হলে তিন তারকা অপেক্ষাকৃত কম হলে দু’টি বা তার চেয়েও কম হলে একটি তারকা চিহ্ন ব্যবহার করি।
মজার হাসির কোন প্রসঙ্গ পেলে হাসির emoji আটকানোর চেষ্টা করি অথবা হা-হা-হা লিখে রাখি।
বিস্ময়কর অবাস্তব ঘটনা বা প্রসঙ্গ এলে!!! দিই। ভালোলাগা লাইনটুকু তৎক্ষণাৎ আত্মস্থ করার চেষ্টা করি। কোন বিষয়ে লেখকের মতের সাথে অমিল হলে পরে নিজস্ব মতামত লিখে রাখি কালো কালিতে। অত্যধিক ভালো লাগলে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাসূচক কথাবার্তাও লেখার চেষ্টা করি।
আর একটি কথা বই পড়া যখন শুরু করি তখন পৃষ্ঠার উপরে নিজের স্বাক্ষর বানানসহ বাংলা ইংরেজি ও হিজরি তারিখ- সন – বারের নাম এবং সময় লিখে রাখি। সম্পূর্ণ বই তাড়াহুড়ো করে শেষ করার জন্য কখনোই খুব বেশি তাড়া অনুভব করি না বলেই স্বাভাবিক গতিতে ধীর-স্থিরভাবে তা পড়ার চেষ্টা করি। তবে কখনো কখনো বই সাইজে ছোট এবং অত্যধিক ভালোলাগার হলে এক বৈঠকে শেষ হয়ে যায়।
বই পড়ার সময় আরেকটি কাজ খুবই জরুরি তাহলো নোট রাখা। অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি হাতের কাছে রাখার নোটবুকে তৎক্ষণাৎ টুকে রাখা পৃষ্ঠা নম্বরসহ। বইয়ের রিভিউ লেখা বা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনে নোটবুকে চোখ বুলালেই যথেষ্ট। যদিও এটা আমার সবসময় করা হয়ে ওঠে না। তবে চেষ্টা করছি নিয়মিত করার। বই পড়া শেষ হলে শেষ পৃষ্ঠায় স্বাক্ষর দিন-তারিখ সময়ের উল্লেখপূর্বক নিজস্ব মতামত সংক্ষেপে লিখে ফেলি।
আর একটা কথা, সচরাচর ধার করে বই পড়ি না । বই ধার করা ও ধার দেয়া যদিও পছন্দের কাজ।
আমার সংগ্রহে বেশকিছু গ্রন্থের পিডিএফ ফাইল রয়েছে। ল্যাপটপ বা মোবাইলের মাধ্যমে মাঝে – মধ্যে তা থেকে পছন্দসই বই পড়ে থাকি । তবে সত্য বলতে- হার্ডকপি পড়ার মজাই অন্যরকম।
নতুন বা পুরাতন বইয়ের গন্ধে অন্যরকম এক আকর্ষণ বোধ করি যা আমার কাছে খুবই ভালো লাগার। তবে কখনও দীর্ঘ সময় বা স্বল্প সময়ে সফরে থাকলে সেখানে হার্ডকপি বহন করা সম্ভব না হলে pdf file থাকলেও পড়ার ক্ষুধা মেটানো যায়! সময়টাও বেশ সুন্দর কাটে। সে হিসাবে পছন্দের কয়েকটি বইয়ের পিডিএফ ফাইল সব সময় মোবাইলে রাখি। টুকটাক পড়িও!
সর্বোপরি, বন্ধুদের আড্ডায় বা কারো সাথে গল্পের সময় বইয়ের অনুরূপ প্রসঙ্গ এলে পরে ওইসব বইয়ের শিক্ষণীয় বিষয় বা লব্ধ জ্ঞান তাদের সাথে নিজের মতো করে শেয়ার করি এবং তাদের কেউ বইটি পড়তে উৎসাহিত করি।
‘বাঙালির বই পড়ার আগ্রহ প্রবল কিন্তু বই কেনার বেলায় এসে অবলা।’- সৈয়দ মুজতবা আলী।
কিন্তু বর্তমানে, আমাদের বই কেনার বেলায় যেমন অবহেলা! facebook আসার পরে অনেক ক্ষেত্রে facebook আসক্তির কারণে বই পড়ার বেলায়ও তেমনি অবহেলা।
আসুন! নিজে বই পড়ি, সুন্দর জীবন গড়ি এবং অন্যদেরকেও বই পড়ায় উৎসাহিত করি।

শিশুদেরকেও বই পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত
গবেষণায় দেখা গেছে যেসব বাচ্চাকে ছোটবেলায় বই পড়ে শুনানো হয় তারা তাদের counterpart বা অন্য বাচ্চারা যাদেরকে বই পড়ে শুনানো হয় না, তাদের চেয়ে ভালো পাঠক হয়। কারণ ছোটবেলা থেকে তারা বই পড়ার সাথে পরিচিত হয়। যাদের বাসায় ছোটখাটো লাইব্রেরি থাকে তাদেরও ভালো পাঠক হিসেবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কেবল বই পড়া যথেষ্ট নয়, কিশোরদেরকে বইয়ের আলোচনায় যুক্ত করতে হবে। সে একটা বই পড়ে কি বুঝতে পারল, কি নতুন তথ্য শিখলো, কোন জিনিসটার সাথে সে একমত, কোন জিনিসটার সাথে একমত নয় তাদেরকে এই ধরনের প্রশ্ন করতে হবে। অবশ্যই প্রথম দিনেই কোন শিশু এই পদ্ধতিতে অসাধারণ কিছু করে ফেলতে হয়ত পারবে না, কিন্তু ২-১ বছরের মধ্যেই তারা ভালো পাঠক হয়ে উঠবে, চিন্তা করতে শিখবে। নিজের মতো করে অ্যানালাইসিস করবে। বেশিরভাগ সময়েই আমরা বাচ্চাদেরকে এই প্রশ্নগুলি করি না। আমরা নিজেরাও এই পদ্ধতির সাথে পরিচিত নই। কিন্তু একবার এই পদ্ধতির সাথে পরিচিত হলে এটা কি সূর্যের ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য অনেক ফলপ্রসূ কিছু হবে।
শিশু-কিশোরদেরকে যাচ্ছেতাই শিখতে দেয়া যাবে না। তাদেরকে বুঝাতে হবে যে কেবল বইটি পড়লেই কোনো জিনিস সত্য হয়ে যায় না। যেকোনো বিষয়কে যুক্তি বুদ্ধি এবং জ্ঞান দিয়ে যাচাই বাছাই করার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। যেকোনো দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভালো reference লাগে এটাও তাদেরকে ছোটবেলা থেকে শেখানো উচিত।
সূত্র মতে, যেসব শিশু-কিশোর কোন কিছু শেখার পরে অন্যদের সাথে শেয়ার করছে, তার বন্ধুদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, যে কোন জিনিসের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারছে তারা অনেক ভালো শিখছে, তাদের analytical skill বাড়ছে। যারা আলোচনা করে শিখছে, অন্যের মত এবং চিন্তার সাথে পরিচিত হচ্ছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে যারা কেবল নিজে নিজে পড়ছে তাদের তুলনায় অনেক গভীর জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠছে। শিশু-কিশোররা বই পড়ার পরে তাদেরকে এই বইয়ের ওপর নিজের ভাষায় একটা summary লিখতে বলা যেতে পারে, ৫ মিনিট এই বইয়ের ওপর কথা বলতে দেয়া যেতে পারে। এটাও তাদের বুঝ শক্তিকে আরও শাণিত করবে। তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করে তাদের নিজের মতকে ডিফেন্ড করার কৌশল শেখাতে হবে। এই জিনিসগুলো রাতে খাবার টেবিলে গল্প বা আড্ডার সময় করা যেতে পারে। কোন একটা ছুটির দিনে পরিবারের সবাই নিজের পছন্দমত বই পড়বেন এবং পারস্পরিক knowledge sharing session করবে এরকম কিছু একটা করা যেতে পারে।
শুধু বিনোদনের জন্য নয়, তাদেরকে ধীরে ধীরে জ্ঞানমূলক বই এবং নিজের লেভেলের চেয়েও কিছুটা কঠিন বইয়ের দিকে নিয়ে যেতে হবে। অবশ্যই শুরু হতে হবে আনন্দের কিছু দিয়ে, সহজ কিছু দিয়ে। তাদেরকে feedback দিতে হবে। কি ভালো করেছি কি আরো ভালো করা যেত এ বিষয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে। তাদেরকে একটা কাজ আরও সুন্দর করে করার, শেখার সুযোগ দিতে হবে। এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে- হ্যাঁ তুমি চেষ্টা করছো এবং উন্নতি লাভ করছো। ভালো কিছু করা যে সহজ না এবং উন্নতি একটা নিয়মিত পদ্ধতি- এ বিষয়ে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন।
সবশেষে তাদের সাথে অন্তরঙ্গতার কোনো বিকল্প নেই। আপনি কয়েকটা মজার বই দিয়ে তাদের সাথে আপনার সম্পর্কের সূচনা করতে পারেন। এই বই হয়তো তার জীবন বদলে দেবে একজন কিশোর হয়ে উঠবে আগামীর ভালো পাঠক, লেখক কিংবা অ্যানালিস্ট।

লেখালেখির পূর্বশর্ত গভীর অধ্যয়ন
পড়ার মাধ্যমে পুঞ্জীভূত জ্ঞানের সমষ্টি একসময় লেখনীশক্তি দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলাও প্রথমে মানুষকে পড়তে বলেছেন এর পরেই কলমের ব্যবহার করতে বলেছেন অর্থাৎ লেখার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। শুধুমাত্র পড়ার জন্য পড়ার চেয়ে অনেক উত্তম হলো লেখার জন্য পড়া। লিখতে না পারলেও অন্তত কোন একটা বিষয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা থাকা এবং সে বিষয়ে নলেজ শেয়ার করা এবং সম্ভব হলে অবশ্যই লেখা উচিত। আর লেখালেখি করতে হলে গল্পের বইয়ের পাশাপাশি জ্ঞানমূলক বই পড়া খুবই দরকার। ধরুন আপনি হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তে ভালোবাসেন। বিনোদনের জন্যই উনার বই খুবই সুপাঠ্য কিন্তু গেম তৈরিতে অংশগ্রহণের জন্য খুব বেশি উপযোগী নয়। পশ্চিমা সভ্যতার উন্নতির পেছনে একটা বড় নিয়ামক হলো গেম তৈরি। তারা প্রতিদিন নতুন নতুন ধারণা তৈরি করছে। এটা তখনই সম্ভব যখন আপনি জ্ঞানমূলক বই পড়বেন।
পৃথিবীর সেরা গ্রন্থ দিয়ে
পাঠাভ্যাসের উন্মোচন হোক

যুগে যুগে বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে কিছু গ্রন্থ। আর যারা পাল্টাতে চেয়েছে তারাও সবার আগে চেষ্টা করেছে সেই গ্রন্থগুলোর আদি-অন্ত পড়ে ফেলার।
মোঙ্গলরা আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালিয়ে বাগদাদের কয়েক লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল। পুরো বাগদাদকে শ্মশান বানিয়ে দিয়েছিল। তারা মুসলিম উম্মাহ সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা করেছিল তা হলো তারা কয়েক লক্ষ বই সংবলিত ‘দারুল হিকমাহ’ নামের বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিটা ধ্বংস করেছিল। মানবসভ্যতা মহামূল্যবান বইগুলো এক এক করে ফোরাত নদীতে ফেলে দিয়েছিল। ফুরাতের স্রোত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বইয়ের স্তূপের কারণে! দীর্ঘদিন ফুরাতের সেই পানি বাগদাদ বাঁশি ব্যবহার করতে পারেন কারণ, তা ঐসব বইয়ের কালি আর মন্ডতে বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল!
মঙ্গলবার সেই কয়েক লক্ষ বই এ জন্যই ধ্বংস করেছিল যে, তারা শুনেছিল, তখনকার দিনের দুই বিশ্ব পরাশক্তি, superpower, রোমান ও পারস্য সভ্যতার ধ্বংস করতে পেরেছিল যে যাযাবর, পশ্চাৎপদ, বর্বর আরবরা, তাদের মূল শক্তি নিহিত ছিল এই বইয়ের মধ্যেই। এই কারণেই তাদের সমস্ত রাগ ছিল বইয়ের ওপরে!
বস্তুত তাদের বিশ্বাস আর ধারণা অমূলক ছিল না। মুসলমানরা একটামাত্র বইয়ের মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদটা সাধন করতে পেরেছিল। সেই বই তথা আরবি ভাষায় সেই কিতাবটা হলো ‘আল কুরআন’। মহাবিশ্ব al-quran! এটা এমন একটা বই যে, এর মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ সংশয় নেই, থাকার উপায় নেই।
এই একটিমাত্র বই বর্বর অশিক্ষিত ও পশ্চাৎপদ আরব জাতিকে মহা ক্ষমতাধর করে তুলেছিল। এতটা ক্ষমতাধর যে, তারা ছয় হাজার বছরের ঐশ্বর্য ও শক্তিসমৃদ্ধ পারস্য সাম্রাজ্যকে, সাড়ে চার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মহাশক্তিধর রোমান সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে তাদের ওপরে নিজেদের কর্তৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
সঙ্গত কারণেই মোঙ্গল তাতাররা ভীত ছিল তাদের ক্ষমতা, নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে, তাই তারা মুসলিম সাম্রাজ্য ধ্বংস করার পাশাপাশি তাদের সমাজ থেকে সব বই ধ্বংস করেছিল।
ইতিহাস কিন্তু সেই মুঘল সেই বর্বর তাতারদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছে। বাগদাদ আক্রমণ ও সেখানে তাদের দ্বারা পরিচালিত পৈশাচিক ধ্বংসযজ্ঞের মাত্র ৪০ বছরের মধ্যেই তাতাররা, মোগলরা নিজেদের অজান্তেই ইসলামের কাছে তথা বিস্ময়কর গ্রন্থ, আল কুরআনের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে দেয়। মোগলরা, তাতাররা মুসলমান হয়ে যায়!
এর কারণটা কী ছিল? একমাত্র দৃশ্যমান কারণ এটা ছিল যে, তারা প্রায় ১১ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা ও তাদের সমাজ তাদের সমস্ত বইপত্র ধ্বংস করার পরেই যে গুটিকতক মুসলমানকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, তার বেশিরভাগই তাদের হাতে বন্দিনী নারী ও মুসলিম নারী। এই নারীদের প্রায় সবাই ছিলেন শিক্ষিতা। তারা প্রত্যেকেই নিজের মন-মগজে শত শত বই এবং মহা বিস্ময়কর গ্রন্থ আল কুরআনের শিক্ষাকে ধারণ করে রেখেছিলেন।
তাতাররা বই ধ্বংস করেছিল বাগদাদের ১১ লক্ষ বই পাঠককে হত্যা করেছিল বটে কিন্তু তারপরেও যে একটি বই পাঠক পাঠিকা কি নিজেদের বিকৃত লালসা মেটানোর জন্য বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই মাত্র গুটিকতক বই পাঠিকার হাতে মাত্র চল্লিশ বছরের মধ্যে তারা নিজেদের লালিত ঐতিহ্য সাম্রাজ্য সভ্যতাকে বিসর্জন দেয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুসলমান হয়ে যায়! কি অসাধারণ ক্ষমতা সেই বইয়ের! ভাবতে গেলেও বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে হয়।
আজ মুসলমান তরুণ যুবকদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে কম। কুরআন তেলাওয়াত এর কিছুটা অভ্যাস থাকলেও যথাযথভাবেই মহাগ্রন্থ অধ্যয়নের কোন ইচ্ছাই আজ যুবসমাজের নেই।
কী লজ্জা! কী নির্মম পরিণতি! নিদারুণ মানসিক বিকৃতি!!
মুসলমান যুবক তরুণদের শোচনীয় মানসিক বিপর্যয় নিয়ে ভাবতে গেলে ক্রোধে-আক্রোশে, অনুতাপে আর অনুশোচনায় চেতনা বিবশ হয়ে আসে যেন, চোখ ফেটে অশ্রু বেরিয়ে আসে, চোখ ভিজে যায়!
নিজেদের বিপর্যয় অবস্থা কাটিয়ে উঠতে হলে, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হলে, করাতে হলে সকল কিছুর আগে আশ্রয় নিতে হবে সেই বইয়ের কাছে, ডুবতে হবে বইয়ের সাগরে, এর পাতায় পাতায়, বিচরণ করে বেড়াতে হবে, নিজেদের সজ্জিত করতে হবে নতুন করে। তাই আমার প্রতিদিনের সকালটা শুরু হোক পৃথিবীর সেরা গ্রন্থ আল কুরআন অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে।

প্রিয় বন্ধুরা
যুগে যুগে জ্ঞানচর্চাকারীরাই মসনদে সমাসীন ছিলেন। আজ মুসলমানরা বসনিয়া থেকে আরাকান পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে নির্যাতিত, অত্যাচারিত, ক্ষমতাচ্যুত, বিচ্যুত। কিন্তু এই মুসলমানরাই এক সময় ছিল পৃথিবীর সেরা জাতি। সোনালি সেই ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল জ্ঞান চর্চার মাধ্যমেই। মুসলমানদের ঘরে ঘরে ছিল বই পড়ার অভ্যাস। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি উদ্যোক্তা ও পরিচালক ছিল মুসলমানরা। বাগদাদের দারুল হিকমা পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাঠাগারটি ছিল গ্রানাডায়। গ্রানাডার এই লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ। ঐ একই সময়ে ইউরোপ জুড়ে সবচেয়ে বড় যে পাঠাগারগুলো ছিল তা ছিল মূলত খ্রিস্টান পাদ্রীদের মঠে বা গির্জায়। আর ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মতে, পুরো ইউরোপব্যাপী কোন গির্জা বা মঠে চার শতের বেশি বই ছিল না। (সূত্র : History of the reign of Ferdinand and Isabella the Catholic. William H prescott, 1837, pp.188)
সে সময় মুসলিম জনমানসই এমন ছিল যে, ছেলে-বুড়ো নারী-পুরুষ কিংবা ধনী-গরিব সবাই বই-পাগল ছিলেন। প্রতিটি বাড়িতে ছিল গ্রন্থাগার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক লাইব্রেরি। কে কার চেয়ে বেশি বই জোগাড় করতে পারে, তা নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলত সমাজবাসীর মধ্যে। একে অপরকে উপহার হিসেবে তারা বই দেয়া নেয়া করতেন। কারো বাড়িতে বেড়াতে গেলেও উপহার হিসেবে বই নিয়ে যেতেন। ইতিহাসে দেখা যায় স্বয়ং খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকাম উপহার হিসেবে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন বই। তার নিজের যে ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল সেখানে বইয়ের সংখ্যা ছিল ষাট হাজার।
আর পশ্চিমা ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের গবেষণায় এটা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ১০ শতাব্দীতে ইউরোপের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি অবস্থান ও বইয়ের বাজার বসতো মুসলিম আন্দালুস তথা স্পেনে।
সেই সমাজে কেবল পুরুষদের বেলাতেই যে এরকম মনোজাগতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটে ছিল তাই নয়, নারীদের বেলাতেও এরকম একইভাবে উত্তরণ ঘটেছিল। তার প্রমাণ আমরা পাই খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকামের আমলে এ ঘটনায়।
রাজ পরিবারের এক যুবকের বিয়ে দেয়ার জন্য খলিফা উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছিলেন। তিনি নিজে অত্যন্ত বিদ্বান ও বিদ্যোৎসাহী, তেমনি তিনি রাজ পরিবারের জন্য সেরকমই একটি পাত্রী খুঁজছিলেন।
তাই খলিফা এক বিস্ময়কর ঘোষণা জারি করলেন পাত্রীর খোঁজ চেয়ে। তিনি ঘোষণা করলেন; গ্রানাডা শহরে যে বাড়িতে বিবাহযোগ্য এমন পাত্রী রয়েছে, যে পাত্রী একদিকে পুরো আল কুরআন মুখস্থ করেছে অর্থাৎ কুরআনে হাফেজ এবং এর পাশাপাশি ইসলামের যে কোন একটি হাদিসশাস্ত্র যার মোটামুটি জানা আছে সেরকম পাত্রীর অভিভাবকরা যেন তাদের বাড়ির বারান্দা বা বেলকুনির বাইরে রাতের বেলায় প্রজ্জ্বোল্যমান বাতি টাঙিয়ে রাখেন।
কেবল খলিফাকেই নয়, পৌর গ্রানাডাবাসীকে অবাক করে দিয়ে সে রাতে শহরের প্রায় প্রতিটি বাড়ির বেলকুনিতেই প্রজ্জ্বোল্যমান বাতি টাঙানো হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কেমন যুবতী মেয়ের উপস্থিতি ছিল, যে মেয়েটি একাধারে কুরআনে হাফেজ আবার অন্যদিকে হাদিস শাস্ত্রেও তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল।
প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ নিয়ে যারা ভাবেন, মুসলমান হিসেবে মুসলিম বিশ্ব নিয়ে যারা ভাবেন, মুসলিমদের একটি স্থায়ী ও অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য যারা নিজের জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। হতাশাগ্রস্ত মুসলিম যুবসমাজের আগামীর আলোর দিশারি হিসেবে যারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও অপসংস্কৃতির মূলোৎপাটনের স্বপ্নধারা বিভোর। বিপ্লব বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক সোনালি সমাজের কারিগর হিসেবে যাদের গড়ে তোলা হচ্ছে, সেই মানুষগুলোকে স্বপ্ন দেখতে হবে এক নতুন বিপ্লবী জ্ঞানচর্চাময় সমাজের। ঘরে ঘরে গড়ে তুলতে হবে পাঠাগার, হাতে হাতে পৌঁছে দিতে হবে বই, নিজে অধ্যয়ন করে জানিয়ে দিতে হবে, আবার সেই সোনালি সমাজ আমরা গড়ব এই বই হাতে নিয়ে- পৃথিবীকে আলোকিত করব ইনশাআল্লাহ।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক প্রেরণা

Wednesday, April 25, 2018

তুরস্কে মাওলানা মওদুদী ও তাফহীমুল কুরআনের প্রভাব



লিখেছেনঃ এরবাকান



সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী (রহঃ )বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ যার ক্ষুর ধার লেখনী ও বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার তাঁকে আজও আমাদের মাঝে জীবন্ত রেখছে। তুরস্ক আজ যে ইসলাম পন্থী একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে এটা তৈরিতে মাওলানার সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম।


ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকনের উপর মাওলানা মওদুদীর প্রভাব-
ডঃ নাজমুদ্দিন এরবাকান হলেন তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের মহান সিপাহ সালার। তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভরে মাওলানা মওদূদীর (রহঃ)নাম নিতেন। তিনি মাওলানাকে ইমাম বলে অবহিত করতেন এবং তার সাহিত্য পড়ার জন্য তার জনশক্তিকে উৎসাহ যোগাতেন। তার মৃত্যুর আগে এরজুরুম শহরের একটি সমাবেশে বলেছিলেন আমি দেখতে পাচ্ছি নিকট ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে জিহাদ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি হবে তাই আপনারা মাওলানা মওদূদীর (রহঃ) 'আল জিহাদু ফিল ইসলাম' বইটি পড়ে নিবেন। তিনি হয়তবা আজকের আইএস এর কথাই বলেছিলেন।
তার প্রতিষ্ঠিত ইসলামী আন্দোলন 'মিল্লি গুরুশে' এর সিলেবাসে মাওলানা মউদূদীর (রহঃ) অনেক বই রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল-

১।তাফহীমূল কোরআন

২। ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলী

৩।ইসলামি রেনেসাঁ আন্দোলন

৪।কোরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা

৫। আ্ল কুরআনের মর্ম কথা।

৬। সমস্যা ও সমধান

৭।আসুন মুসলিম হই।

৮। আসুন দুনিয়াকে পরিবর্তন করি।

৯। খিলাফাত ও রাজতন্ত্র

১০। ইসলাম পরিচিতি।

তুরস্কের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে নিয়মিত তাফহীম পাঠ করা হয়ে থাকে। কিছু কিছু রয়েছে যারা এক যুগের ও বেশী সময় ধরে নিয়মিত ভাবে তাফহীম পাঠ করে আসছেন। প্রতি বছর বিভিন্ন সংগঠের উদ্যোগে তাফহীমুল কোরআন পাঠ প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে।

তুরস্কে ২ টি প্রকাশনা থেকে তাফহীম প্রকাশিত হয়ে থাকে। একটি ৭০ এর দশকে প্রকাশিত হয়েছে অপরটি হয়েছে ২০০০ সালের পর। বর্তমান সময়ে চিন্তার দ্বন্দে মাওলানা মওদূদীর (রহঃ) সাহিত্যের যেন কোন জুড়ি নেই। যিনি শত বছরের সকল জঞ্জাল কে মুছে ফেলে আমাদের সামনে এক নিরেট ইসলাম পেশ করার লক্ষে আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন। বাংলাদেশ জামায়াতেে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের শাহাদাত এবং এই দলটিকে ঘিরে ইয়াহুদি ও সাম্রাজ্য বাদীদের মাথা বাথা যেন তুরস্কে মাওলানা মউদূদীর (রহঃ) সাহিত্যের প্রভাবে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে

Source: Facebook page

তুরস্কের শীর্ষ আলেম , তুরস্ক সরকারের ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং তুরস্কের গ্র্যান্ড মুফতি শায়েখ ড. আলি আরবাশ হাফিঃ বলেন -
" তাফহিমুল কোরআন হলো তুরস্কের যুবকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য তাফসীর। আমরা তুরস্কের যুবকদেরকে এই তাফসীর পড়তে উৎসাহিত করি "।

Popular Posts